বাংলাদেশী ব্যান্ডের ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাস

bangladeshi banad 300x169 বাংলাদেশী ব্যান্ডের ভাঙ্গা গড়ার ইতিহাসআকাশ২৪ ডেস্কঃ সম্প্রতি দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীন থেকে ব্যান্ডটির শ্রোতা নন্দিত ভোকাল তানযির তুহিন দলছুট হয়ে যাওয়ার ঘোষণায় বিমর্ষ হয়ে পড়ে তুহিন ভক্তরা। তুহিনের বিচ্যুতিকে সরাসরি শিরোনামহীন ব্যান্ডের ভাঙন বলা না গেলেও দলের ভাঙন বলা যেতেই পারে। তবে বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসে এটিই প্রথম ভাঙন নয়।

স্বাধীনতাপূর্ব পাকিস্তান আমলে জন্ম নেওয়া প্রথম বাংলা ব্যান্ড আইওলাইটসও শিকার হয়েছিল ভাঙনের। দলের ড্রামার সাব্বির এবং গিটারিস্ট রফিক দল ত্যাগ করার ফলে ভেঙে গিয়েছিল দলটি। আইওলাইটস এর সমসাময়িকেই বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্ম নিয়েছিল আরেকটি ব্যান্ড। সেটির নাম ছিল জিংলা শিল্পগোষ্ঠী

আইওলাইটস ও জিংলা শিল্পগোষ্ঠী- এ দুয়ের মধ্যে কোনটি প্রথম বাংলা ব্যান্ড এ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। তবে উভয় ব্যান্ডই ভেঙে গিয়েছে। জিংলা শিল্পগোষ্ঠীর ভোকালের নাম ওমর খালেদ রুমী। তিনি পরবর্তীতে দল থেকে বিদায় নিয়ে আরেকটি ব্যান্ডের হয়ে কাজ করেন। জিংলার পরপর ঐ চট্টগ্রামেই জন্ম নিয়েছিল আরেকটি বাংলা ব্যান্ড, নাম ছিল ব্যান্ড লাইটনিংস। এটি গঠিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। ফরিদ রশীদনিওম্যান্ডেজনোয়েল ও শাকিল নামে কজন সঙ্গীতমনস্ক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে ছিল এ গানের দলটি।

ব্যান্ড লাইটনিংসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাহমুদ, তোতা, চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল ও ফারুক মিলে গঠন করেছিলেন র‌্যাম্বলিং স্টেনস নামে আরেকটি ব্যান্ড। এ দুটি দলই পাকিস্তান আমলে ব্যাপক জনপ্রিয়রতা লাভ করেছিল বাংলাদেশ।

দুবছর গড়াতে না গড়াতেই ভাঙনের কবলে পড়ে র‌্যাম্বলিং স্টেনস। এ দলের সদস্যরা পৃথক হয়ে গিয়ে তৈরি করেছিল নতুন দল টাইম গো মোশন

এবার আসা যাক স্বাধীনতা উত্তর বাংলা ব্যান্ডসমূহের ভাঙনের প্রসঙ্গে। স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সাল থেকেই এ দেশে বেশ কিছু ব্যান্ড গঠিত হয়। সেসব দলের মধ্যে কিছু কিছু ব্যান্ড বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং কিছু কিছু ব্যান্ড অনেক রদবদল করে এখন পর্যন্ত টিকে আছে। আগলি ফেসেস, আন্ডার গ্রাউন্ড পিস লাভারস, স্পন্দন ও উচ্চারণ ব্যান্ডের কোনো কার্যক্রম এখন চোখে পড়ে না।

স্পন্দন ব্যান্ড থেকে ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ফিরোজ সাঁই, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী থেকে ফকির আলমগীর যুক্ত হয়েছিলেন উচ্চারণ ব্যান্ডে। এই ব্যান্ডে ছিলেন পপ সম্রাট আজম খান। পরবর্তীতে উচ্চারণ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হন পিলু মমতাজ। ফলে উচ্চারণ ব্যান্ড সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল এই পাঁচ গুণী শিল্পীর সমন্বয়ে। এ পাঁচজনকে তৎকালীন বলা হতো পাঁচপীর। কিন্তু সেই পাঁচপীরও বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি উচ্চারণ ব্যান্ডকে।

স্বাধীনতা পরবর্তীতে গঠিত হওয়া সুরেলা’ সঙ্গীত দল ভাঙনের কবলে পড়ে বিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় সোলস ব্যান্ডে। এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘয়ু সম্পন্ন ব্যান্ড। ১৯৮৫ সালে সোলস থেকে বেরিয়ে নকীব খান গঠন করেন রেঁনেসা। এছাড়াও ঐ সোলস ব্যান্ডেই ১০ বছর লিড গিটারিস্ট হিসেবে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। এরপর নিজেই গড়েন এলআরবিব্যান্ড। তৎকালীন এই ব্যান্ডে আইয়ুব বাচ্চু ছাড়াও ছিলেন স্বপন, টুটুল ও রিয়াদ। একটি সময় রিয়াদের বিচ্যুতি ঘটে এলআরবি থেকে। এছাড়াও নিজের সলো ক্যারিয়ার গড়তে এলআরবি ছেড়ে যান এসআই টুটুল।

১৯৭০ সালের দিকে গঠিত হয়েছিল ব্যান্ড ফিডব্যাক। ভোকাল ছিলেন মাকসুদ। কিন্তু ১৯৯৬ সালে ফিডব্যাক ছেড়ে ঢাকা ব্যান্ড তৈরি করেন তিনি।

১৯৭৬ সালে গঠিত হওয়া বালার্ক ব্যান্ডের একই দশা। আশির দশকে বালার্ক ছেড়ে হ্যাপী আখন্দইমতিয়াক ও কামালল্যারীর প্রতিষ্ঠা করা ব্যান্ড মাইলসে যোগ দেন। মাইলস গঠিত হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। মতান্তরে এ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮১ সালে হয়েছে বলেও ধারণা করেন অনেকে। কাল পরিক্রমায় মাইলসে যুক্ত হন হামিদ ও শাফিন। কিন্তু ২০১০ সালে ব্যান্ডে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায় পৃথক হয়ে যান শাফিন। পৃথক হয়ে রিদম অব লাইফ নামে নতুন একটি ব্যান্ড করেছিলেন তিনি। অবশ্য এই একই বছরে পুনরায় মাইলসে ফিরে আসেন শাফিন।

১৯৮৪ সালের ৫ জুন নাগাদ যাত্রা শুরু করে ওয়ারফেইজ ব্যান্ড। প্রচুর ভাঙা গড়ার মধ্য দিয়েই তিন দশক ধরে টিকে আছে এ ব্যান্ডটি। ফিলিংস ভেঙে অর্থহীন ব্যান্ড হয়ে যাওয়া ব্যান্ডের বেইজ গিটারিস্ট সুমনও একটা সময় ছিলেন ওয়ারফেজেই।

ফিলিংস নামের ব্যন্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে। অতঃপর ফিলিংস ভেঙে তৈরি হয় দুটি ব্যান্ড, নগর বাউল ও অর্থহীন। ব্যান্ড শিল্পী পান্থ কানাইয়েরও আবির্ভাব আদি ফিলিংস তথা বর্তমান নগর বাউল থেকে। পরবর্তীতে তাণ্ডবনামের ব্যান্ড করেছিলেন পান্থ কানাই। তিনি বর্তমানে আছেন অণর্ব অ্যান্ড ফ্রেন্ডসএর সঙ্গে।

অর্থহীন ব্যান্ডের উদ্ভব ১৯৯৯ সালে। সে সময় রুমি তার ব্যান্ড দ্য ট্র্যাপ‘ ত্যাগ করে সুমনের দলে যোগ দেন। এই বছরই ব্যান্ডের নাম ঠিক হয় অর্থহীন। কয়েকমাস পর ব্যান্ডের দুই সদস্য যুবায়ের এবং আদনান দলত্যাগ করেন। ২০০১ সাল নাগাদ অর্থহীন ব্যান্ড ছেড়ে যান রুমি। এর দলনেতা বেইজ গিটারিস্ট সুমন ১৯৯৩ সাল নাগাদ ছিলেন ফিলিংস ব্যান্ডে।

১৯৯০ এর দিকে আবির্ভাব হয় ব্যান্ড আর্কএর। ভোকাল ছিলেন হাসান। পরবর্তীতে তিনি আর্ক থেকে বেরিয়ে যানস্বাধীনতা নামে একটি ব্যান্ড তৈরি করেন করেন। অতঃপর সেই স্বাধীনতা ব্যান্ড থেকেও বেরিয়ে হাসান জন্মভূমিনামের একটি ব্যান্ড করেন।

১৯৯৯ সালে আসে ব্যান্ড দল ব্ল্যাক। নিজেদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ার কারণে সেটিও ভেঙে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জন, জাহান, টনি, তাহসান ও মিরাজ। সলো ক্যারিয়ার গড়তে তাহসান বেরিয়ে যান ব্ল্যাক থেকে। জন বেরিয়ে গঠন করেন ইন্দালো নামের ব্যান্ড।

এ শতাব্দীর শুরুর দিকে নতুন ঘরানার ব্যান্ড দল নিয়ে উপস্থিত হয় বাংলা ব্যান্ড দল। আনুশেহ, বুনো ও অর্ণবের রকিং কম্বিনেশনে গঠিত হয় এটি। সেখান থেকে বেড়িয়ে অণর্ব প্রেয়ার হল নামে একটা ব্যান্ড করেছিলেন। সেটি টেকেনি। বর্তমানে অর্ণব অ্যান্ড ফ্রেন্ডস নামে একটি ব্যান্ড আছে অর্ণবের।

২০০২ সালে গঠিত ব্যান্ড দল চিরকুট বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। এর ভোকাল সুমি। তবে এই ব্যান্ড দল থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন ব্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পিন্টু ঘোষ।

বর্তমান সময়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যান্ডের নাম দূরবীন। প্রায় তের বছর আগে গঠিত হওয়া এ ব্যান্ড থেকে বিদায় নেন কাজী শুভ ও আরেফিন রুমি। তবে দলনেতা ও ভোকাল শহীদ আছেন আগের মতোই।

এই ছিল ভাঙার গল্প। এখানে কেবল সে সমস্ত ব্যান্ডের কথা উল্লেখকরা হয়েছে, সেগুলো ভাঙা কিংবা সদস্য বিচ্যুতির মধ্যে দিয়ে এসেছে। এগুলো ছাড়াও বাংলাদেশে আরও অনেক ব্যান্ড রয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, উপরে ব্যান্ড ভাঙার সংবাদে আর্টসেলএর নাম আসেনি। অথচ এটিও বাংলাদেশের শীর্ষ শ্রেণির ব্যান্ডগুলোর একটি। এই ব্যান্ডটির উদ্ভব ১৯৯৯ সালে। চার বন্ধুর প্রচেষ্টায় তৈরি এ ব্যান্ডের ভাঙন সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

কেবলমাত্র ভাঙনকে কেন্দ্র করে সংবাদটি লেখা, আর তাই- কোন ব্যান্ডে বর্তমানে কে কে রয়েছেন কিংবা তাদের বর্তমান ব্যস্ততা কী, সেটা উল্লেখকরা হয়নি। সেই সংবাদ না হয় অন্য কোনো সংবাদে আলাদা করে তুলে ধরা হবে কোনো একদিন। এই সংবাদের ব্যবহৃত তথ্যাদি ইন্টারনেটের বিভিন্ন আর্টিকেল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

সৌজন্যে ঃ শিবলী আহমেদ, ফিচার লেখক, বিনোদন

Facebook Comments
Shares 0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *