একাত্তরের জননী বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই

একাত্তরের জননী বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীআকাশ২৪ ডেস্কঃ একাত্তরের জননী’ খ্যাত বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর সোমবার ভোর চারটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ছাড়েন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭৭ বছর।

রমা চৌধুরী কোমরে আঘাত, গলব্লাডার স্টোন, ডায়াবেটিস, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হন। গতকাল সন্ধ্যায় অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। সেখানেই ভোর চারটার দিকে না ফেরার দেশে চলে যান একাত্তরের এই বীরাঙ্গনা। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে রমা চৌধুরীর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। আজ চট্টগ্রাম শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বোয়ালখালীর গ্রামের বাড়িতে রমা চৌধুরীকে সমাহিত করা হবে।

এর আগে অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) গিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হন। চমেকের বারান্দায় তিন ঘণ্টা পড়ে ছিলেন চরম অবহেলায়। সেবা না পেয়ে ক্ষোভে ও অপমানে রাত ১টায় হাসপাতাল ছেড়ে নগরীর মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রমা চৌধুরী। তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ)। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী ছিলেন। থাকতেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়। তাঁর স্বামী ভারতে চলে যান। ১৩ মে সকালে পাকিস্তানি সেনারা এসে চড়াও হয় তাঁর ঘরে। এ সময় দুগ্ধপোষ্য সন্তান ছিল তাঁর কোলে। এরপরও তাঁকে নির্যাতন করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা গানপাউডার দিয়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়ি। পুড়িয়ে দেয় তাঁর সব সম্পদ। নিজের নিদারুণ এই কষ্টের কথা তিনি লিখেছেন ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে।

রমা চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য, একাত্তরের জননী, স্বর্গে আমি যাব না, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন, শহীদদের জিজ্ঞাসা, নীল বেদনার খাম, এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য, সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি।

জয়লাভের পর ২০ ডিসেম্বর তাঁর বড় ছেলে সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর ১ মাস ২৮ দিন পর মারা যায় আরেক ছেলে টগর। এরপর তিনি জুতা পরা বাদ দেন। পরে অনিয়মিতভাবে জুতা পরতেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আরেক ছেলে মারা গেলে পুত্রশোকে তিনি আর জুতা পায়ে দেননি। খালি পায়ে হেঁটে নিজের লেখা বই বিক্রি করে চলতেন এই নারী।

রমা চৌধুরী ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মজীবন শুরু করেন। পরে দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 3 =