গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি : খাল কেটে অসন্তোষ ডেকে আনা?

জাফর উল্লাহ সোহেল :
সিরিজের প্রথম টেস্টে অজিদের হাতে নিজেদের মাটিতে ভারতীয়দের নাস্তানাবুদ হওয়ার ঘটনা অনেকে দেখছেন খাল কেটে কুমির আনার মতো বিষয় হিসেবে। স্পিনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে নিজেরাই ঘায়েল হলো তারা। প্রথম ইনিংসে অজি স্পিনারদের তোপের মুখে ভারত অলআউট হয়ে যায় মাত্র ১০৫ রানে।

১৯৪৮ সালে নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অতি উৎসাহী সমর্থকদের পরামর্শ শুনে এরকমই ভুল করেছিল জিন্নাহ ও খাজা নাজিম উদ্দিন। সম্প্রীতির পাকিস্তান হয়ে যায় বিক্ষোভ আর অসন্তোষের আরেক নাম। অতিরিক্ত উর্দুপ্রীতি দেখাতে গিয়ে বাঙালি তোষামোদকারীদের কথা শুনে শেষ পর্যন্ত গোটা পূর্ব পাকিস্তানকেই হারাতে হয়েছিল পেয়ারে পাকিস্তানের ধ্বজাধারীদের।

উপরের উদাহরণ দুটি দেয়ার উদ্দেশ্য হলো- বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেও যেন অতি উৎসাহী লোকের অভাব নেই। সরকারের জন্য ‘ভালো করছি ভালো করছি’ জপতে জপতে কখন, কীভাবে তারা ক্ষতিটা করে বসছেন সে খেয়াল নেই। ৫ জানুয়ারির প্রহেলিকা কাটিয়ে উঠে আওয়ামী লীগ সরকার যখন কিছুটা হলেও গণমুখী উন্নয়ন আর নানা ইতিবাচক ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে একরকম অভ্যস্ত করে এনেছে তাদের শাসনে তখন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে; খুবই স্পর্শকাতর ইস্যুও বলা যায়, সরকারকে একরকম জনগণের মুখোমুখিই করে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে এমন অতি উৎসাহীদের কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন এক লাফে গ্যাসের দাম ৩০০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত (৩ মাসের ব্যবধানে দুই ধাপে)।

বাংলাদেশে কী এমন বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে, সরকারের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে জনগণের ওপর একের পর এক বোঝা চাপিয়ে দিতে হবে? মাত্রই কিছুদিন হলো ব্যক্তিগত কর এবং ভ্যাটের একটা বেড়াজাল তৈরি করা হয়েছে প্রত্যেক নাগরিককে ঘিরে। একান্ত রাস্তার ফকির ছাড়া কেউ এখন আর ট্যাক্সের আওতার বাইরে নেই। এমনকি ফকিরও সরকারকে ট্যাক্স দেয় ভ্যাটের মাধ্যমে। এক কেজি আটা বা এক পোয়া তেল কিংবা ফার্মেসি থেকে দুটো ওষুধ কিনতে গেলেও তাকে ভ্যাট দিয়েই আসতে হয়। এটা ভালো। দেশের উন্নতির স্বার্থে সবাইকে ট্যাক্স দিতে হবে। কিন্তু যাদের ওপর ট্যাক্স আরোপ হলো এবং যত আরোপ হলো, সেটা বাস্তবতার নিরীখে কতটা ঠিকভাবে হয়েছে সে প্রশ্ন কিন্তু উঠেছে।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির যে ঘোষণা এলো তা অনেকের কাছেই এমন বিষের মতো মনে হচ্ছে যে, একান্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে হা-হুতাশ শুরু হয়ে গেছে। গত কয়েকদিনের ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো দেখলেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। একেকজনের স্ট্যাটাস এমন, পড়লে মনে হয় যেন দেশে দুর্ভিক্ষ লেগে যাবে বা মহামারি, মড়ক লেগে যেতে পারে, এরকম কিছু। এসব হয়ত হবে না। তবে জীবনযাত্রায় যে একটা বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত। আর জীবনের চাকায় যদি অচলায়তন সৃষ্টি হয় তা থেকে মনে অসন্তোষের জন্ম হবে না-তা কে বলতে পারে?

এক ফেসবুক বন্ধু বিষয়টা দেখিয়েছেন তার নিজের ঘরের পরিস্থিতি দিয়ে। তার বাসায় চারটা চুলা আছে। মানে ডাবল দুটি। এতদিন তাকে এর পেছনে ব্যয় করতে হত ১৩০০ টাকা। এখন জুন থেকে এক লাফে তা করতে হবে ১৯০০ টাকা। ৬০০ টাকা বাড়তি গুনতে হবে। এরপর এই দামবৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য অনেক কিছুরই দাম বাড়বে। যেমন, গাড়ি ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাদ্যদ্রব্য প্রভৃতি। একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। তিনি হিসাব করে দেখলেন, মাসে প্রায় ৩-৪ হাজার টাকার বাড়তি ধাক্কা লাগবে তার ওপর। কিন্তু বেতন তো তার এখন বাড়বে না। তাহলে কী করে তিনি সংসার টানবেন?

আরেকজন লিখেছেন, তার বাড়িতে আট-দশটা পরিবার ভাড়া থাকে। গ্যাস ও বিদ্যুত বিল তারই দেওয়ার নিয়ম। এখন এক যোগে যেভাবে দাম বাড়ানো হলো, চাইলেই তো সে হুট করে বাড়িভাড়া বাড়াতে পারবে না। এক চা দোকানি খুব আক্ষেপ করে বলল, ‘ভাই, দেখেন তো সকারের কাণ্ড, এক লগে কি আমগো ইনকাম এত বাড়ে? আমরা তো এমনিতেই টানাটানিতে আছি।’

নানা জনের নানাবিধ রকমের সমস্যা। এক সরকারি সিদ্ধান্তে, একটিমাত্র কলমের খোঁচায় কত মানুষের কত হিসাব গরমিল হয়ে যায় তা কি জানেন সংশ্লিষ্টরা? সুতরাং প্রথমে ১৫০, তারপর ৩০০-এভাবে এটি কিন্তু কয়েকশ টাকার বিষয় নয়; অনেক অনেক জীবনের অনেক অনেক হিসাব এখানে জড়িত। ‘এতদিন ভর্তুকি দিয়েছি, আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক যুক্তি আছে’-এসব বললেই যে মানুষ সব মেনে নেবে তা কেবল দূরাশা।

সুতরাং মাননীয় সরকার, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির এই অবাস্তব সিদ্ধান্তটি নেয়ার আগে আপনি কি দেশের জনগণের মনের ভেতরে কী কাজ করছে বা কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে চিন্তা করেছেন? মনে হয় না। আপনারা বেশ কয়েকবার গণশুনানি করেছেন। কিন্তু যারা সেখানে গেছেন তারা বলছেন তাদের কথা রাখা হয়নি। তাহলে এই শুনানি করে লাভ কী? শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো ‘শুনানি হয়েছে’ বললেই কিন্তু জনগণ মেনে নেবে না। জনগণ দেখবে- যা কিছুই তার প্রতি সরকারের তরফ থেকে আসুক, তা কতটা সহনশীল, কতটা সে বইতে পারবে সে বোঝা। যদি সে বোঝাটা বইতে না পারে, তবে এর নিচে চাপা পড়ে মরার চেয়ে সে কিন্তু তার সর্বস্ব দিয়ে একটা শেষ ধাক্কা দিতে চাইবে। যা কিন্তু শেষ বিচারে কারো জন্যেই মঙ্গলের হবে না।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নিজেই বলেছেন মাত্র ৩৫-৪০ লাখ মানুষ বাসাবাড়িতে গ্যাস ব্যবহার করেন। তাহলে এই মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারের কত টাকা মুনাফা হবে? এর চেয়ে ঢের বেশি টাকা কি চলে যাচ্ছে না দুর্নীতি আর অনিয়মের ছিদ্র দিয়ে? সেইসব ছিদ্র যদি সরকার মেরামত করতে পারে তবে জনগণের ওপর নতুন কোনো চাপ সৃষ্টির চিন্তা করতে হবে না। এক হিসাবে দেখা গেছে, গতবছর গ্যাস বিক্রি করে সরকার ১৬ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। এই বাড়তি দামে সরকার আরো না হয় ৩-৪ হাজার কোটি টাকা বেশি আয় করবে, এর বেশি তো নয়? এর চেয়ে বেশি টাকা কি এ দেশের ব্যাংকগুলো থেকে লুট হয়ে যায়নি?

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ এবং এ দেশের মানুষ এমন মন ও মননে দিনে দিনে অগ্রসর হচ্ছে, তাদের কেউ আটকে রাখতে পারবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতির বিশ্লেষকরা যেভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন বাংলাদেশকে নিয়ে, আমার ধারণা, তার চেয়েও ভালো করবে বাংলাদেশ। এবং তা করবে, যদি দেশে সুশাসন থাকে এবং একটা স্থিতিশীল পরিবেশ থাকে। সেই পরিবেশটা নিশ্চিত করা এখনকার সরকারের জন্য মোটেও কঠিন কাজ নয়। সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে কীভাবে বরং পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়, মনে হচ্ছে সেই দিকেই যত নজর সরকারের ভেতরের কারো কারো। না হলে এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত একেবারে হেসে হেসে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর মুখ থেকে বের হওয়ার কথা নয়। সরকার এবং সরকারি লোক যত যুক্তিই দিক না কেন, খোদ আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক এই সিদ্ধান্তের পক্ষে নেই, এটা জোর গলায় বলা যায়। এ ব্যাপারে দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে জরিপ করা যেতে পারে।

একজন ফেসবুকবন্ধু এবং গণমাধ্যমকর্মী সম্প্রতি হিসেব করে দেখিয়েছেন, গ্যাসের দাম বরং কমানো উচিত ছিল সরকারের। এখানে নিশ্চিতভাবেই কোন একটা পক্ষকে, একটা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দিতেই এমন কঠিন সিদ্ধান্তের ঝুঁকি নিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। আমি বলব না, এটা সরকার করেছে বরং বলব সংশ্লিষ্ট বিভাগই এটি করেছে। এর পেছনে কারা আছে, কাদের স্বার্থটা বেশি কাজ করেছে তা খুঁজে বের করা দরকার। এর একটা বিচার বিভাগীয় তদন্তও করা যেতে পারে। শোনা যাচ্ছে, কনজিউমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ‘ক্যাব’ সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবে। সাধারণের জন্য সেখান থেকে নিশ্চয়ই ভালো কোনো সিদ্ধান্ত আসবে।

মুরুব্বিরা প্রায়ই বলেন, ‘দেখিস, পচা শামুকে যেন পা না কাটে’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও বিনয়ের সুরে বলতে চাই, এমন কোনো সিদ্ধান্তে সায় দেয়া উচিত হবে না, যা আদতে সরকারের বিপক্ষে গণ-অসন্তোষ ডেকে আনতে পারে। এবং যে সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সেই অর্থে খুব একটা লাভবানও হবে না। শেষ বিচারে আপনি যা কিছু করছেন তা তো জনগণের উন্নয়নের স্বার্থেই; সেই উন্নয়ন করতে গিয়ে যদি জনগণের ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে শেষ বিচারে তা সরকারেরই ক্ষতি। বিবেচনার সময় কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

বাংলাদেশের অহংকার দেশরত্ন শেখ হাসিনা

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী :
ভিনদেশী রোহিঙ্গা নারী যখন তার নাড়িছেড়া ধন, আদরের নবজাতকের নাম রাখেন শেখ হাসিনা; সর্বস্ব হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা শেখ হাসিনার মানবিকতায় কতটা বিমুগ্ধ আর অভিভূত, এ উপলব্ধির জন্য চোখ বন্ধ করতে হয় না। শুধু বাঙালি নয়; বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের মনের গহীন কোনে আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আসন গেড়েছেন, তার আকাশসম বিশাল মানবিকতা, হƒদয় উজাড় করা ভালবাসা আর মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে। মানবতার জননী এ মহানুভব নেত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জন্মদিন ২৮ সেপ্টেম্বর।

জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন কলকাতায় ভারত ভাগের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং লেখাপড়া নিয়ে মহাব্যস্ত, ১৯৪৭ সালের এদিন টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। গ্রামের নদী-নালা-খাল-বিলের স্রোতের শব্দ এবং সবুজ প্রকৃতির গন্ধ মেখে তার শৈশব কাটে। সেখানেই শিক্ষা জীবন শুরু হয়। মা ফজিলাতুননেছা রেণুর ছায়াসঙ্গী হয়ে পিতার রাজনৈতিক জীবনকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখেন এবং নিজেকে এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে একজন আদর্শময়ী হিসেবে গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই আদরের নয়নমণি ছোট্ট ‘হাসুমনি’ মানবিকতা আর ন্যায়বোধ দিয়ে বাংলাদেশের প্রিয় নেত্রী হয়ে বিশ্বনেত্রীর মর্যাদায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের ভিপি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ঘোষণার পর; এর সপক্ষে এটি ছিল প্রথম ম্যান্ডেট। সেদিন শেখ হাসিনা পরাজিত হলে ইতিহাস অন্যভাবেও লিপিবদ্ধ হতে পারত। বাবার আন্দোলন সংগ্রামে মা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সঙ্গে আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাও ছিলেন ছায়াসঙ্গীর মতো। একাত্তরে বন্দিদশায় জন্ম নেওয়া সন্তান কম্পিউটার বিজ্ঞানী সজীব ওয়াজেদ জয় আজ আধুনিক বাংলাদেশ গড়ায় কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্বময় আলোকিত। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অটিজম বিশেষজ্ঞ।

স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে পুরো পরিবারকে হারিয়ে ‘৭৫ থেকে ‘৮১ সাল পর্যন্ত ছয় বছর শেখ হাসিনাকে প্রবাসে কষ্টের জীবন কাটাতে হয়। তার সাথে ছিলেন পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকা ছোট বোন শেখ রেহানা। স্বাধীনতার স্থপতিকে হারানো ভাগ্যহারা বাঙালির স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় ১৭ মে ১৯৮১ সাল। দীর্ঘ ছয় বছর বিদেশে আশ্রিত জীবন শেষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচত হয়ে বাংলার মাটিতে পা রাখেন জাতির জনকের কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। ক্যু-হত্যা-গুম-খুনের বিরুদ্ধে শুরু হয় তার মানবিকতার সংগ্রাম। ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে জনগণের মানবাধিকার নিশ্চিত করেন তিনি। নিকট অতীতে তার হাত দিয়ে সম্পন্ন হয় বেশিরভাগ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচার, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদন, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি, বিনামূল্যে কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বই বিতরণ, উপবৃত্তির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় সফলতা। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের কা-ারী দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের মানবিক রূপ। এ সময়ে বার বার দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করা হয়। এত কিছুর পরও শেখ হাসিনাকে মানবতার জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন।

দেশরত্ন শেখ হাসিনা শুধু জাতীয় নেতাই নন, তিনি আজ তৃতীয় বিশ্বের একজন বিচক্ষণ বিশ্বনেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, উদার, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানমনস্ক জীবনদৃষ্টি তাকে করে তুলেছে এক আধুনিক, অগ্রসর রাষ্ট্রনায়ক। একবিংশ শতাব্দীর অভিযাত্রায় দিন বদল ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কা-ারি তিনি। সারা বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়ীত মানুষের ভরসাস্থল। বিশ্ব মানবতা যখন মুখ থুবড়ে পড়ছে, মানবতার ঝা-া হাতে শেখ হাসিনা তখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় নীপিড়ীত মানুষের কণ্ঠস্বর। শেখ হাসিনার ঘোর শত্রুরাও আজ তার মানবিকতার প্রশংসা করছেন।

সর্বশেষ, বিশ্ব সব গণমাধ্যম দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে বলেছে, ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’। ২০১৬ সালে শান্তিতে নোবেল জয়ী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্ব মানবতার বিবেক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আরেক নোবেল জয়ী কৈলাস সত্যার্থী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্ব মানবতার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে তুলনা করেছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান শেখ হাসিনাকে একজন ‘বিরল মানবতাবাদী নেতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এক বক্তৃতায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করে বলেছেন, ‘বাবার মতোই বিশাল হৃদয় তাঁর। সেখানে ভালোবাসার অভাব নেই।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিলেন বাঙালির হৃদয় কত বড়। তিনি বাঙালির গর্ব।’ গার্ডিয়ান পত্রিকায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে বিশাল মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বিরল। তিনি যে একজন হৃদয়বান রাষ্ট্রনায়ক- তা তিনি আগেও প্রমাণ করেছেন, এবারও প্রমাণ করলেন।’ ইন্ডিয়া টুডে তাদের দীর্ঘ এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘শেখ হাসিনার হৃদয় বঙ্গোপসাগরের চাইতেও বিশাল। যেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে কার্পণ্য নেই।’

আসলে দেশরত্ন শেখ হাসিনার হৃদয়ের গভীরতার সঙ্গে বঙ্গোপসাগর বা আটলান্টিকের গভীরতার তুলনা প্রতীকী। হৃদয়ের গভীরতা উপলব্ধি করতে হয় হৃদয় দিয়ে; এর পরিমাপ হয় না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষকে ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে যিনি আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের জীবন বাঁচিয়েছেন, খাবার দিয়ে ক্ষুধা মিটিয়েছেন, সেই দেশরত্ন শেখ হাসিনার হৃদয়ের গভীরতা উপলব্ধি করে বিদগ্ধজন প্রতীকী তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। আসলে দেশরত্ন শেখ হাসিনার তুলনা তিনি নিজেই। একসঙ্গে ১০ লাখ শরণার্থীকে এমন একটি ছোট দেশে আশ্রয় দেয়ার সাহস দেখিয়েছেন তিনি। সারা বিশ্ব দেখল, মানবতা এমনও হতে পারে!

শুধু রোহিঙ্গাই নয়; মাতৃ¯েœহের এমন অনেক বিরল দৃষ্টান্ত এর আগেও স্থাপন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা। নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকা-ে নিঃস্ব-রিক্ত পিতৃমাতৃহীন রুনা আর রত্নাকে নিজ কন্যার মর্যাদা দিয়ে ওদের গণভবনে এনে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু-তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। পরে আরও এক নিঃস্ব মেয়ে আসমাকেও কন্যা¯েœহে একই অনুষ্ঠানে বিয়ে দিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সব স্বপ্ন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এই তিন মেয়ের বিয়ের জন্য শাড়ি, গহনা এবং জামাইদের পোশাক আর সংসার সাজানোর আসবাবসহ সবকিছুরই ব্যবস্থা করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত আগ্রহে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাতৃ¯েœহের দীপ্তির মাঝে ওরা ফিরে পায় নিজের পিতা-মাতাকে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম শেখ ফজিলতুন্নেসা মুজিব শেখ হাসিনাসহ বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারটিই একটি মানবিক দৃষ্টিসম্পন্ন পরিবার, যারা সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন এ জাতিকে। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, অসহায়ের প্রতি সংবেদনশীলতা শেখ পরিবারের ঐতিহ্য। তরুণ শেখ মুজিব নিজেদের ধানের গোলা থেকে ধান নিয়ে দরিদ্র ও অসহায় প্রতিবেশীর মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকাবস্থায় সংগঠন চালানোর জন্য দলের কর্মীদের খরচ যোগাতে নিজের গহনা বিক্রি করে দিয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। সেই বাবা-মায়েরই কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট যখন ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকা- ঘটানো হয় ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বাসভবনে। সে সময় শেখ হাসিনা জার্মানিতে ছিলেন স্বামীর সঙ্গে। সঙ্গে তার ছোট বোন শেখ রেহানাও ছিলেন। স্বামী প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ আলী মিয়া তখন জার্মানিতে গবেষণারত ছিলেন। দুই বোন এ জন্যে প্রাণে বেঁচে যান। মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে তারা দুই বোন পরিবারের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক এ বাড়িটি জনসাধারণের জন্য দান করে দেন। এই বাড়ি এখন বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম। একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে। এই ট্রাস্ট প্রায় দুই দশক ধরে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত গরিব-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি দিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ক্ষমতায় এসে তার মানবিকতার হাত আরো প্রশস্ত হয়। মাতৃ মমতায় দেশরত্ন শেখ হাসিনা এতিম শিশুর মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন, পরম শ্রদ্ধায় অশিতিপর বৃদ্ধাকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছেন- তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় তুলে আনার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছেন, জাতীয় বাজেটে তাদের জন্যে আলাদা বরাদ্দ রাখছেন, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ঈদ-পার্বণে তাদের জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন-আশ্রয়হীনের জন্য ঘর বানিয়ে দিচ্ছেন, তাদেরকে কাজ দিচ্ছেন। কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে দেশের দরিদ্র মানুষ হাতের নাগালে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে, বিনামূল্যে ওষুধও পাচ্ছে। প্রথমবার ক্ষমতায় এসে মূল বাজেটের বাইরে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়েছিলেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সফল কর্মকা-ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্থা, আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি সম্মানিত এবং প্রসংশিত হয়েছেন, যা তিনি বাংলাদেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছেন।

এমন একজন গর্বিত মা, গণতন্ত্র ও মানবতার জননী, সফল রাষ্ট্রনায়ক, বিশ্ব মানবতার বিবেক, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার দেশরত্ন শেখ হাসিনার জন্মদিন ২৮ সেপ্টেম্বর। দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য তিনি যে স্বপ্ন দেখেন তা সফল হোক, তিনি দীর্ঘজীবন লাভ করুন- এই কামনা। জয়তু শেখ হাসিনা।

লেখক : সংসদ সদস্য এবং সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।